ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট’-এর একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গবাদি পশু পাচার সংক্রান্ত ৬২৭টি ঘটনায়—যেখানে সন্দেহভাজনদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে—তার মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশ ক্ষেত্রেই মুসলিম ব্যক্তিরা পুলিশের গুলির শিকার হয়েছেন। শুক্রবার এপি (অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস)-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
এপি স্বতন্ত্রভাবে ২০০টিরও বেশি ঘটনা পর্যালোচনা করে একটি সাধারণ ধরন খুঁজে পেয়েছে: পুলিশ প্রায়শই মুখোমুখি সংঘর্ষের সময় সন্দেহভাজনদের পায়ে—বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হাঁটুর নিচে—গুলি করেছে।
পুলিশ এই গুলিবর্ষণের ঘটনাগুলোকে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করলেও, আঘাতের ধরন এবং ফরেনসিক মূল্যায়ন তাদের এই ব্যাখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক মেডিসিনের অধ্যাপক ড. মো. কালিম খান জানিয়েছেন, আঘাতের ধরনগুলো পুলিশের দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে—যেখানে বলা হয়েছে সন্দেহভাজনরা পালিয়ে যাচ্ছিল বা পুলিশের ওপর আক্রমণ করেছিল—সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এগুলোকে তিনি খুব কাছ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে চালানো গুলির চিহ্ন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মানবাধিকার কর্মী, বিরোধী দলীয় নেতা এবং স্থানীয় বিচারকদের মতে, এই গুলিবর্ষণের ঘটনাগুলো বিচারবহির্ভূত শাস্তির শামিল। এর মাধ্যমে আদালত কর্তৃক অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই পুলিশ ব্যক্তিদের আহত করছে এবং ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ায় যে আইনি সুরক্ষা থাকার কথা, তা এড়িয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে ‘অপারেশন লেম’ (Operation Lame) নামে পরিচিত এই চর্চাটি উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের শাসনামলে আরও প্রসারিত হয়েছে। তিনি একজন বিশিষ্ট হিন্দু জাতীয়তাবাদী এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্য।
ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের অধীনে গবাদি পশু সুরক্ষা একটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে গবাদি পশু কেনাবেচা ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত মুসলিমরা কঠোর নজরদারির মুখে পড়েছেন, বিশেষ করে গবাদি পশু জবাই ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধকারী আইনগুলোর কারণে।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে মুসলিমদের অস্বাভাবিক উচ্চ হার এই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে যে, পুলিশি পদক্ষেপকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে প্রান্তিক করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, উত্তর প্রদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এই ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।
এলাহাবাদ হাইকোর্ট সতর্ক করে বলেছে যে, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পায়ে গুলি করার ঘটনা যেন একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে; আদালত এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে আইনের শাসনের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছে।
এই গুলির ঘটনাগুলো অনেক পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আহত ছয়জন মুসলিম ব্যক্তির স্বজনরা এপি (AP)-কে জানিয়েছেন যে, তাদের প্রিয়জনেরা এখন আর কাজ করতে সক্ষম নন এবং তাদের পরিবারগুলো এখন অনুদান ও ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
প্রেস টিভি:
0 Comments